চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত পূর্তগীজ ভবনটির বয়স প্রায় সাড়ে তিনশ বছর।
১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ও পর্যটক ভাস্কো দা গামার ভারত আগমনের পর ১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মালাকা দখল করে নিলে এসময় বাংলার বিভিন্ন সমুদ্র পথে তাদের যাতায়াত বেড়ে যায়। ১৫২৮ সালে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে পর্তুগিজরা একটি কারখানা ও কাস্টমস ঘর স্থাপন করে, যা খুব দ্রুত প্রায় ৫ হাজার পর্তুগিজ বা ইউরেশীয় সম্প্রদায়ের বিস্তার ঘটায়। যারা পর্ববর্তীতে কর্ণফুলী নদীর দুই পাড় এবং পাশ্ববর্তি দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপের বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
সে সময় তারা আমাদের দেশ থেকে মসলিন কাপড় আর সুগন্ধী মসলা নিয়ে যেতো আর সুযোগ পেলেই চালাতো লুটপাট। পাহাড়ের চুড়ায় সুদৃশ্য পূর্তগীজ ভবনটি নির্মাণ করে ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করত তারা। চারপাশে ছিল নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভবনের উপর বসানোর থাকত কামান।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, ভবনের নিচ দিয়ে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল পূর্তগীজরা। সুড়ঙ্গ দিয়ে নদীতে গিয়ে ডাকাতি করে আবার ফিরে আসতো পূর্তগীজ ডাকাত দল। ভবনটির নির্মাণ শৈলীও একেবারেই অভিনব। কোন লোহার ভিত্তি ছাড়াই মাত্র দশ ইঞ্চি প্রস্থ ইটের দেয়ালেই তৈরি হয়েছে দ্বিতল এই ভবন।
চট্টগ্রামের মহসিন কলেজের পূর্তগিজ ভবনে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য ভবন ও মূল ক্যাম্পাস দু’দিক থেকেই পথ রয়েছে। পাহাড় বেয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর প্রসস্থ সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দেখা যাবে দু’দিকে বিশাল আকৃতির দু’টি গম্বুজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী এ ভবনটি।
ভবনটির একদিকে ছোট্ট একটি কটেজ। অপর দিকে টিন শেডের কিছু খুপড়ি ঘর। সামনের অংশে মহসিন কলেজের মসজিদ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় বিপদজনক এই ভবনের পাশ দিয়েই যাতায়াত করতে হয় সবার। পূর্তগীজ ভবনের পশ্চিম পাশের গম্বুজটিও ফাঁটল ধরে মূল ভবন থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ঝুঁকে আছে মসজিদের দিকে। যে কোন মুহুর্তে মসজিদের ওপর ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে।
ভবনের দক্ষিণ পাশের দেয়াল থেকে অনেক ইট ইতোমধ্যে খসে পড়েছে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের এ পূর্তগিজ ভবনটি। তবে আর কতদিন দাড়িয়ে থাকতে পারবে তার নিশ্বয়তা নেই। প্রশাসন ঘরগুলো সংস্কার না করায় এখন আর কেউ যায় না ওদিকে। সংস্কারের অভাবে পূর্তগীজ ভবনটি ক্রমেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। যে কোন মুহুর্তে ধসে পড়ে ভবনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা বয়ে আনতে পারে।
এছাড়াও ভবনটি ইতোমধ্যে প্রকৌশল বিভাগ থেকে পরিত্যাক্ত ও বিপদজনক ঘোষণা করা হয়েছে। ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়েছে। ইট কংক্রিটও থেমে থেমে খসে পড়ছে। এতে আহত হচ্ছে ভবনের পাশ দিয়ে চলাচলকারী পথচারী ও কলেজের শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা।
চট্টগ্রাম শহরের ১০-১২টি প্রাচীন ভবনের মধ্যে এটি সবচেয়ে পুরনো। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও রহস্যঘেরা এই ভবন পূর্তগিজদের স্মৃতি বহন করে চলেছে আজো। পুরনো কীর্তি সংরক্ষণের ব্যাপারে চট্টগ্রাম কতটা পিছিয়ে আছে তারই প্রমাণ এই পূর্তগিজ ভবন। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত এই ভবনটি এখন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
0 Comments